কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: বুধবার, ৩০ জুলাই, ২০২৫ এ ১১:০৬ PM
কন্টেন্ট: খবর প্রকাশের তারিখ: ২৯-০৭-২০২৫ আর্কাইভ তারিখ: ০১-০১-২০৩১
বিশ্ব বাঘ দিবস ২০২৫
প্রতি বছরের ন্যায় এ বছর ২৯ জুলাই বিশ্বের অন্যান্য বাঘ সমৃদ্ধ দেশের সাথে বাংলাদেশেও পালিত হয় বিশ্ব বাঘ দিবস ২০২৫। এ উপলক্ষ্যে বন অধিদপ্তরের হৈমন্তি মিলনায়তনে একটি আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান; বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ। এছাড়াও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত প্রাণিবিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আলী রেজা খান, বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, প্রাক্তন প্রিন্সিপাল ওয়াইল্ডলাইফ স্পেশালিষ্ট, দুবাই সাফারি পার্ক, দুবাই; অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম, প্রধান নির্বাহী, ওয়াইল্ড টিম, এবং IUCN এর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ বিপাশা হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক জনাব মোঃ আমীর হোসাইন চৌধুরী। আলোচনা অনুষ্ঠানে এবারের প্রতিপাদ্যের উপর আলোচনা উপস্থাপন করেন ড. এম এ আজিজ, অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং জনাব ইমরান আহমেদ, বন সংরক্ষক, খুলনা অঞ্চল, বন অধিদপ্তর। বাঘ ও বাঘের আবাসস্থল সংরক্ষণে জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মূলত দিবসটি পালন করা হয়।
২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত বাঘ সমৃদ্ধ ১৩টি দেশের রাষ্ট্র প্রধানদের সম্মেলনে বাঘ সংরক্ষণকে বেগবান করার জন্য যে ঘোষণাপত্র তৈরি হয় সে আলোকেই প্রতি বছর ২৯শে জুলাই বাঘ সমৃদ্ধ দেশসমূহে বিশ্ব বাঘ দিবস পালন করা হয়। অন্যান্য বছরের ন্যায় এ বছরও ঢাকাসহ সুন্দরবনের চারটি রেন্জে বিশ্ব বাঘ দিবস উদযাপন করা হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- “বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি, সুন্দরবনের সমৃদ্ধি”।
বাঘ আমাদের জাতীয় প্রাণী ও বীরত্বের প্রতীক। আইইউসিএন বাংলাদেশের বাঘকে মহাবিপন্ন প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ২০১০ সনে ১৩টি টাইগার রেঞ্জ দেশের মধ্যে বর্তমানে মাত্র ১০টি দেশে- বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইলান্ড, মিয়ানমার ও চীনে বাঘ আছে। ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে বাঘ গণনা করে সুন্দরবনে ২০১৫ সালে ১০৬টি, ২০১৮ সালে ১১৪ টি এবং ২০২৪ সালে ১২৫টি বাঘ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সুন্দরবনে বিগত ১০ বছরে প্রায় ১৮% বাঘ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে মহাবিপন্ন বাঘ সংরক্ষণের জন্য সুন্দরবনের বাঘ ও হরিণের সংখ্যা ধারণ ক্ষমতার মধ্যে রেখে অবৈধ হরিণ শিকার বন্ধ, বাঘের আবাসস্থলের উন্নয়ন সাধন ও নিয়মিত টহল পরিচালনা করার মাধ্যমে বাঘের অস্তিত্ব রক্ষা সহ বনে বাঘের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য যথোপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সুন্দরবনে আধুনিক সফটওয়্যার ভিত্তিক ডিজিটাল স্মার্ট প্যাট্রোলিং ও ড্রোন ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ সনাক্ত করে আসামী গ্রেফতার করা হচ্ছে। ফলে সুন্দরবনের বন অপরাধ হ্রাস পেয়েছে এবং এখানের জীববৈচিত্র্য এখন অধিক সুরক্ষিত।
অপরাধ উদঘাটনে (তথ্য প্রদানকারী) পুরস্কার প্রদান বিধিমালা, ২০২০- এ বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে বাঘ সংক্রান্ত সংঘটিত অপরাধ উদঘাটিত হলে তথ্য প্রদানকারীকে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা এবং বনাঞ্চলের বাহিরে অপরাধ উদঘাটিত হলে তথ্য প্রদানকারীকে সর্বোচ্চ ২৫,০০০ টাকা পুরস্কার প্রদানের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মানুষ ও বন্যপ্রাণী দ্বন্দ্ব নিরসনের লক্ষ্যে বাঘ আক্রমণে নিহত বা আহত মানুষের ক্ষতিপূরণ প্রদানের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বৃদ্ধি করে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লক্ষ এবং আহত ব্যক্তির পরিবারকে সর্বোচ্চ ১ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিধান “বন্যপ্রাণীর আক্রমণে জানমালের ক্ষতিপূরণ বিধিমালা-২০২১” এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য সুপেয় মিঠাপানির চাহিদা মেটাতে সুন্দরবনে ৮৪টি পুকুর খনন করা হয়েছে। ঝড়-জলোচ্ছাসের সময় বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আশ্রয়ের জন্য ১২ টি মাটির উচু কিল্লা নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়াও, বাঘ মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে লোকালয় সংলগ্ন সুন্দরবনে ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ নাইলনের ফেন্সিং তৈরি করা হয়েছে। বন বিভাগের সহায়তায় সুন্দরবন সংলগ্ন লোকজনদের নিয়ে বাঘ সংরক্ষণের জন্য ৪টি সিএমসি (Co-management Committee), ২১১ টি ভিসিএফ (Village Conservation Forum), ৪৯টি ভিটিআরটি (Village Tiger Response Team), ২২টি সিপিজি (Community Patrolling Group) গঠন করা হয়েছে এবং ১৮৩ জন সিপিজি সদস্যকে সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় মাসিক ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।
জনবসতি আছে এমন ৬০ কিলোমিটার এলাকায় নাইলনের ফেন্সিং বা বেষ্টনী তৈরি, ঘূর্ণিঝড় ও উচ্চ জলোচ্ছ্বাসে বাঘ যেন নিরাপদ আশ্রয় পায় সে লক্ষ্যে বনের মধ্যে ১২টি মাটির কেল্লা নির্মাণসহ গবেষণা সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
সুন্দরবন শুধু বাঘের আবাসস্থল নয়, বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জনসাধারণের জীবন-জীবিকার মূল আধার। তাই আসুন আজ আমরা সবাই এ রাজকীয় প্রাণিটির সর্বশেষ আবাসস্থল সংরক্ষণে বলিষ্ট ভূমিকা পালন করতে এগিয়ে আসার অঙ্গীকার করি।
